লিখব ভেবেছিলাম আজ অনেক দিন ধরেই । কিন্তু, কোনমতেই লেখা হচ্ছে না । প্রতিবার-ই দেখি কী-বোর্ডের মধ্য দিয়ে যে শব্দগুলো আসছে তার কোনটাই আমার মনের ধারেকাছেও নেই । সেই অজুহাতে হতে পারে বেশ অনেকদিন ভুলে বসে আছি । যেভাবে আধো-ঘুম ভেঙে ওঠা স্বপ্ন মনে থাকবে বলে আবার চোখ বুজে ফেলি সকাল হতেই দেখি এর কিচ্ছুটিই আমার স্মৃতিতে নেই, ঠিক সেভাবেই এই অহেতুক শব্দজাল বিছানোর কথা থাকলেও বারবার ভুলে যাচ্ছি । স্বপ্নঘোর একসময়-না-একসময় কেটে যায়, কিন্তু এটি ?
‘ইনফাইনিট রিগ্রেস অব কজস’এর কথা বারবার মনে আসছে । একটা ঘটনার ‘কারণ’ এর অতীতের একটা ঘটনা, আবার অতীতের সেই ঘটনা’র কারণ তারও আগের একটা ঘটনা… এভাবে চলতে থাকলে তো তা ইনফাইনিট ঘটনা “কারণ” হিশেবে থাকবে । সবক্ষেত্রে এই অসীম কারণ থাকলে সমস্যা না । কিছু ক্ষেত্রেই কী-কী যেন থাকে, সেই খোঁড়া যুক্তি এখন আর মাথায় ধরছে না । তবে, কোন এক লোডশেডিং-এর শহরের অন্ধকার রুমের বসে থাকা কোন বিষণ্ণ মানুষের এই সময়টার পেছনে হয়তো অসীম-সংখ্যক কারণকে আমরা দায়ী করতে পারি না । সর্বোচ্চ করতে পারি তার জন্ম’কে । “জন্মই যেন আজন্ম পাপ…” ।
PTSD’র বিগত হওয়া কারণগুলো খুঁজতে গিয়ে আমি বারবার থমকে যাচ্ছি । “থমকে যাওয়া” বলে যেই অনুভূতি বোঝাতে চাচ্ছি, তা আসলে কতটুকু সঠিক আমি জানি না । কোন কারণে এই অসময়ে দাঁড়িয়ে আছি, তা নিরূপণ করা অন্তত আমার কাছে দারুণ কঠিন হয়ে উঠেছে । কানে ভেসে আসা নানা শব্দের সমাহার । আমি বুঝতে পারি না, ঠিক কোন জায়গায় গিয়ে আমার থামা উচিত । যেখানে গেলে আমি আমার “অপটিমাম” প্রথম কারণ খুঁজে পাব ।মাঝেমধ্যে হয়-কি লাগে যেন, ভর্তি প্রস্তুতিতেই গলদ করেছি । কিছুদিন এই পথে, তারপর ঐ পথে । আমি এখনো ঠিকমতো বুঝতে পারি না, মানুষ কীভাবে নিমিষেই জানতে পারে যে তার কোন পথে যাওয়া উচিত, তাকে দিয়ে সেই পথে হাঁটা হবে কি হবে না । সেই শুরু থেকেই আমি বুঝতে পারিনি। যে পথেই বেরোই, সেই পথে হোঁচট খেয়ে আঁচড়ে পড়া যেন নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার । বারবার হোঁচট খাওয়া আমার মনে করিয়ে দেয়, আমার নেওয়া সিদ্ধান্ত ভুল । ইনফাইনিট রিগ্রেশন’এর বদলে আমার আছে “ইনফাইনিট রিগ্রেটস” । তবুও, শত পাথরে হোঁচট লাগার পরেও ঐ একই পথ ধরে আমি হেঁটে চলেছি, চলছিই। জেনে-না-জেনেই। কিংবা নতুন রাস্তায় উঁকি দেওয়ার সাহসটুকু যেন আমার ফুরিয়ে গিয়েছে। তারাপদ রায়ের সেই “আলগা বিশ্বাস” যেন মনের কোথাও কোন এক কোণে থাকে বারবার, তাকে সহস্র বিবাদেও ফেরানো যায় না।
”এই সেদিন পর্যন্ত ভেবেছি, সব ঠিক হয়ে যাবে।
কবে কখন কেমন করে, কি ভাবে ঠিক হবে,
এবং সত্যিসত্যি কি ঠিক হবে,
এবং ঠিক না হলেই বা কি হবে,
সে বিষয়ে অবশ্য কোনো চিন্তা করিনি
কোনো ধারণাও ছিলো না।
শুধু কোথায় কেমন একটা-আলগা বিশ্বাস ছিলো,
মনে মনে ধরে রেখেছিলাম,
একদিন সব ঠিক হয়ে যাবে।
আমলকি গাছের ভেতর থেকে কোনো কোনো রাতে
যে রকম ঝিরিঝিরি বাতাস ও বাতাসের শব্দ আসে,
যেভাবে লেবুপাতা ছিঁড়ে হাতে ঘষলে
এক হারিয়ে যাওয়া অরণ্যের গন্ধ ভেসে আসে,
যে ভাবে ঘুলঘুলির এলোমেলো বাসায়
ডিমের ভেতর থেকে বেরিয়ে এসে
চড়ুইয়ের ছানারা তাদের মাকে চি-চি করে ডাকে,
যে ভাবে ভুল ঠিকানার চিঠিও একদিন
কোথাও না কোথাও, কারো না কারো কাছে পৌঁছে যায়
যে ভাবে…
একটা ক্ষীণ ভরসা ছিলো এই সেদিন পর্যন্ত,
যে ভাবে এইসব ঘটে, এই সব ঘটে যায়
সেইভাবে একদিন সব ঠিকঠাক হবে।
আমার কিছু করণীয় নেই, শুধু বসে থাকার অপেক্ষা।” [১]
আবার মনে হয়, আমি বেশকিছু রাস্তায় অল্পদূর গিয়েই অন্য পথের খোঁজে নেমেছি। এভাবেই, চলতে গিয়েই সেই গন্তব্যের কোন নিশানাই আমার মেলেনি। ভেবে-ভেবে যে তীরে আমি পৌঁছাই সেখানকার সবকিছুই ঝাপসা, কোন সদুত্তর নেই, নিজের চিন্তার কাছেই যেন আমি অচেনা-অজানা এক মুসাফির, যে শুধু এক চিন্তাখেলার ধাঁধায় নিজেকে ধাঁধিয়ে এক কাল্পনিক সুখ-রচনায় ব্যস্ত..
তারপরেও, আমার এক স্পষ্ট উত্তর চোখে দেখার বাসনা জাগে। যেভাবে পরীক্ষার আগে ঘুমানোর বাহানায় শুয়ে পড়লেও জেগে রইতাম। যেভাবে জানলা দিয়ে শীতের অবসন্ন কুয়াশা দেখা দিত, পূর্ণিমার চাঁদের আলো আমার মশারি সাঁতরিয়ে চোখের রড (rode) সেলকে উজ্জীবিত করতো চোখ বন্ধ না করার জন্য । তাতেও কী হয়? একসময় গিয়ে চোখ ঝিমিয়ে আসে অজান্তেই। সেভাবে কি খুব শিগগির-ই আমার এই ইচ্ছেরও অবসান চলে আসবে?
লিখতে-লিখতে ভাবছি, যা লেখা হচ্ছে তা আসলে আমি-আমার কথাই লিখছি না। বাক্যগুলো এমনভাবে সাজাচ্ছি যেন তার কোন কৈফিয়ত আমার কোনদিন দেওয়া না লাগে। কৈফিয়ত দিতে আমার ভারী অসহ্য লাগে। আমি যা লিখতে চাই তা লিখি না কেন সেই উত্তরও আমার কাছে কেন জানি নেই।
উত্তর খোঁজার চেষ্টা গাধার খাটুনি। তার চেয়ে বরং ঢের ভালো কিছু মনে রাখা যাক।
“মেসবাড়ি” যেভাবে শুরু হয়েছিল, ভাবতাম শেষ হবে অন্যভাবে। “আনন্দের কথা এই যে” যা ভেবেছিলাম তা তো হয়নি। যে-রকমটাই শুরু অনেকটা সেভাবেই এর ইতি ঘটছে, হতে চলেছে। আমরা একেক দিন একেকজন মেসে উঠেছিলাম। কেউ ক্লাস শুরুর একমাস, দুই সপ্তাহ, কেউবা ক’দিন আগেই। শুরুতে যেভাবে সবাই কিছুটা চুপচাপ থাকতাম, কথার পিঠে কথা বলার আগে একটু ভাবতাম.. শেষের দিকেও তাই হয়ে গিয়েছি। অন্তত আমি। “এই তো আর কদিন’বা আছি! ” আমার মনে হতো সবাই একদিনেই মেসবাড়ি ছাড়ব। অবশ্য তা হয়নি, আমরা এক এক করে অন্য উদ্দেশ্যে যাত্রা নিচ্ছি এই মেসবাড়ি থেকে.. যেতে যেতে আর প্রায় অর্ধেকের কমে এসেছে এখন। আরেক মাসের মধ্যেই সবাই প্রায় এই নেটওয়ার্কের বাইরে।
”আনন্দের কথা” বলার সময়, কবিতাটিও মনে পড়ছে। অনেক আগে শুনলেও, এই কয়েকদিন ধরে কেন জানি বারবার শুনছি, কানে যেন কেউ ফিসফিসানির মতো বলে যাচ্ছে।
“আনন্দের কথা এই যে,
যাদের আসার কথা ছিল
তারা কেউ আসেনি ।
যাদের যাওয়ার কথা ছিল
তারা সবাই চলে গেছে ।
আনন্দের কথা এই যে,
একা একা হয়ে গেলে
যত খারাপ লাগবে ভেবেছিলাম
তা তো লাগছে না ।
বরং এই যে কয়েকটি চড়াই
নিজেদের মধ্যে চেঁচামেচি করছে,
ঘরের ছাদে মসৃণ হেঁটে যাচ্ছে
একটা দুধসাদা টিকটিকি,
ঘড়ির কাঁটা এগোচ্ছে টিকটিক করে—
কতকাল এসব খেয়াল করিনি ।
এখন এমন আপন লাগছে এইসব,
আনন্দের কথা এই যে,
যারা যাবার গেছে
যারা আসার আসেনি ।” [২]
এভাবে সব চলতে-চলতে আমি শুধু নিজের দিকে তাকাই। তাকিয়ে ভাবি কোন কবিতাটি আমার সবচেয়ে বেশি পড়া উচিত। এবার শব্দতরঙ্গ না, আসে হৃদতরঙ্গ.. আমি আবার ফিরে যাই সেই ভর্তি-পরীক্ষায় ফেলে আস সব সাইকোলজিক্যাল টেস্টে । যেখানে…
”সব কথা তোমাকে জানাবো ভেবেছিলাম
কিনে এনেছিলাম আকাশি রঙের বিলিতি হাওয়াই চিঠি
সে চিঠির অক্ষরে অক্ষরে লেখা যেত
কেন তোমাকে এখনো চিঠি লেখার কথা ভাবি
লেখা যেত
আমাদের উঠোনে কামিনী ফুলগাছে
এবার বর্ষায় ফুলের ছড়াছড়ি
তুমি আরেকটু কাছে থাকলেই
বৃষ্টিভেজা বাতাসে সে সৌরভ তোমার কাছে পৌঁছতো
আর তোমার উপহার দেওয়া সেই স্বচ্ছন্দ বেড়ালছানা
এখন এক মাথামোটা অতিকায় হুলো
সারা রাত তার হুঙ্কারে পাড়ার লোকেরা অস্থির।
তোমাকে জানানো যেত,
এবছর কলকাতায় গ্রীষ্ম বড় দীর্ঘ ছিল
এখন পর্যন্ত বর্ষার হাবভাবও খুব সুবিধের নয়।
এদিকে কয়েকমাস আগে
নিউ মার্কেট অর্ধেকের বেশী পুড়ে ছাই।
আর দুনম্বর হাওড়া ব্রিজ শেষ হওয়ার আগেই
যেকোনো দুনম্বরি জিনিসের মত ঝুরঝুর করে ভেঙে পড়ছে।
এদিকে এর মধ্যে আবার নির্বাচন এসে গেল,
অথচ কে যে কোন দলে, কার পক্ষে তা আজও জানা গেল না।
কিন্তু এসব তোমাকে কেন জানাবো?
এসব খবরে তোমার এখন কোনো প্রয়োজন নেই।
অথচ এর থেকেও কি যেন তোমাকে জানানোর ছিল,
কিছু একটা আছে, কিন্তু সেটা যে ঠিক কি
পরিষ্কার করে আমি নিজেও বুঝতে পারছি না।
টেবিলের একপাশে কাঁচের কাগজচাপার নীচে
ধুলোয়, বাতাসে বিবর্ণ হয়ে আসছে হাওয়াই চিঠি।
তার গায়ে ডাকের ছাপের চেয়ে একটু বড়,
অসতর্ক চায়ের পেয়ালার গোল ছাপ,
পাখার হাওয়ায় সারাদিন, সারারাত ফড় ফড় করে ডানা ঝাপটায়
সেই ঠিকানাবিহীন রঙিন ফাঁকা চিঠি।
অথচ তোমার কাছে
তার উড়ে যাওয়ার কথা ছিল।” [৩]
সূচনা যেমনটা একাকীত্ব-নিঃসঙ্গতা দিয়ে হয়েছিল, পরিসমাপ্তিও কেন জানি তাই-ই হয়ে দাঁড়িয়েছে । অনেকটা এমন।
“একা থাকার এই ভালো লাগায় হারিয়ে গিয়েছি, নিঃসঙ্গতা আমাকে আর পাবে না ” [৪]
সবশেষের শেষ কথা এই যে, সবকিছুর-ই ইতি ঘটে। সব ফুরিয়ে যায়। দিন, রাত, পূর্ণিমা বা অমাবস্যা। সময়।
“নক্ষত্রেরও মরে যেতে হয়, হয় নাকি ?” [৫]
[১] : সব ঠিক হয়ে যাবে, তারাপদ রায়
[২] : আনন্দের কথা, তারাপদ রায়
[৩] : সব কথা তোমাকে জানাবো ভেবেছিলাম, তারাপদ রায়
[৪] : রুদ্র মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ (কোন কবিতা জানি না, অনেক আগে শুধু লাইনটুকুই পেয়েছিলাম )
[৫] : দুজন, জীবনানন্দ দাশ